আগরতলা, ১২ আগস্ট: বিদ্যুৎ মন্ত্রী রতন লাল নাথের সাংবাদিক সম্মেলনের পর এবার স্মার্ট মিটার, বিদ্যুৎ বিল এবং পরিষেবা নিয়ে পাল্টা বক্তব্য রাখলেন প্রাক্তন বিদ্যুৎ মন্ত্রী তথা সিপিআইএম নেতা মানিক দে। বুধবার আগরতলায় সিপিআইএম রাজ্য কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করে তিনি অভিযোগ করেন, ২০১৮ সালের পর থেকে বিদ্যুৎ পরিষেবা, বিল এবং স্মার্ট মিটার নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে একাধিক অভিযোগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না বলেও দাবি করেন তিনি।
মানিক দে বলেন, স্মার্ট মিটার নিয়ে বর্তমান বিতর্ককে নতুন বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না। বামফ্রন্ট সরকারের সময়ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন লস কমানো, টেকনিক্যাল লস হ্রাস এবং গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন ও উন্নত পরিষেবা দেওয়াই ছিল সেই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাংক ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সে সময় বিদ্যুৎ পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের অন্যতম শর্ত হিসেবে নির্দিষ্ট এলাকায় স্মার্ট মিটার বসানোর বিষয়টিও সামনে আসে।
তবে প্রথমদিকে স্মার্ট মিটারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার প্রশ্ন তুলেছিল বলে জানান মানিক দে। তাঁর দাবি, পুরনো মিটার পরিবর্তন করে নতুন মিটার বসানোর পর আবার কেন স্মার্ট মিটার বসাতে হবে, তা নিয়ে আপত্তি ছিল। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে আলোচনা এবং প্রকল্পের শর্ত বিবেচনা করে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার স্মার্ট মিটার বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, টেন্ডারের মাধ্যমে নির্বাচিত সংস্থা মিটার সরবরাহ করলেও বিদ্যুৎ নিগমের ব্যবস্থাপনায় সেগুলি স্থাপন করা হয়েছিল। সেই সময় স্মার্ট মিটার নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে বড় ধরনের অভিযোগ বা অসন্তোষ তৈরি হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
মানিক দে জানান, ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত রাজ্যে বিদ্যুৎ গ্রাহকের সংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে সাত লক্ষ। এর মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ হাজার স্মার্ট মিটার বসানো হয়েছিল। তাঁর প্রশ্ন, সেই সময় যদি স্মার্ট মিটার নিয়ে বড় ধরনের সমস্যা থাকত, তাহলে গ্রাহকদের কাছ থেকে ব্যাপক অভিযোগ আসত। কিন্তু তেমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
তাঁর মতে, ২০১৮ সালের পর পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে। গোটা দেশে সমস্ত গ্রাহককে ধাপে ধাপে স্মার্ট মিটারের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বেসরকারি সংস্থার অংশগ্রহণও বেড়েছে।
এই প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, কোনও গ্রাহকের বাড়িতে স্মার্ট মিটার বসানোর পর মিটারে ত্রুটি দেখা দিলে, অতিরিক্ত বিল এলে বা মিটার পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে তার দায়িত্ব কার? বিদ্যুৎ নিগম, সরকার নাকি সংশ্লিষ্ট বেসরকারি সংস্থার—এ বিষয়ে স্পষ্টতা থাকা প্রয়োজন বলে দাবি করেন তিনি।
মানিক দে আরও বলেন, বর্তমানে বহু গ্রাহকের অভিযোগ, পুরনো মিটারের তুলনায় স্মার্ট মিটারে একই ধরনের বিদ্যুৎ ব্যবহার করেও বেশি বিল আসছে। এই অভিযোগের কারণ কী, বিল নির্ধারণের পদ্ধতি কী এবং মিটারের রিডিং কতটা নির্ভুল—এসব বিষয়ে সরকারকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে।
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, স্মার্ট প্রযুক্তির বিরোধিতা করছে না বামফ্রন্ট। বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন প্রয়োজন। কিন্তু প্রযুক্তির নামে যদি সাধারণ গ্রাহকের উপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপানো হয়, বিল ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার অভাব থাকে কিংবা মিটার সংক্রান্ত সমস্যার দায়িত্ব কোনও পক্ষ নিতে না চায়, তাহলে তার বিরোধিতা করা হবে।
স্মার্ট মিটার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, সঠিক মিটার রিডিং, বিল তৈরির পদ্ধতি এবং গ্রাহকদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সুস্পষ্ট ব্যবস্থা চালুর দাবি জানান প্রাক্তন বিদ্যুৎ মন্ত্রী।
পাশাপাশি স্মার্ট মিটার নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করারও দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে মিটার সরবরাহ, স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কোন সংস্থার—সরকারকে তা স্পষ্টভাবে জানাতে হবে বলেও দাবি করেন মানিক দে।
Leave a Comment