জাপানের কুমামোতো ভূমিকম্প (Kumamoto Earthquake) ঘিরে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিম জাপানের কুমামোতো (Kumamoto) প্রিফেকচারে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর বহু ভবন ধসে পড়েছে, শপিং মলে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। এখনও বহু মানুষ আটকে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। সরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৩-তে পৌঁছেছে, আহত হয়েছেন বহু মানুষ এবং লক্ষাধিক বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে চারটা নাগাদ কিউশু (Kyushu) দ্বীপের কুমামোতো প্রিফেকচারে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। প্রথমে এর মাত্রা ৭.১ বলা হলেও পরে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা সংস্থা (USGS) তা সংশোধন করে ৬.৮ জানায়। ভূমিকম্পের পরপরই সুনামি সতর্কতা জারি করা হলেও কিছু সময়ের মধ্যেই তা প্রত্যাহার করা হয়।
ভূমিকম্পের কেন্দ্র কোথায় ছিল?
USGS-এর তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় শহর উতো (Uto)-র কাছে ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল, যা কুমামোতো শহর থেকে প্রায় ৪৮ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে। কুমামোতো জাপানের চারটি প্রধান দ্বীপের একটি কিউশুর অংশ এবং নাগাসাকি (Nagasaki) থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
ভূমিকম্পের পর গভীর রাতে আরও একটি ৪.১ মাত্রার আফটারশক অনুভূত হয়েছে বলে জানিয়েছে এনএইচকে (NHK)। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগামী এক সপ্তাহ আফটারশকের ঝুঁকি থাকবে, যার মধ্যে প্রথম দুই থেকে তিন দিন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ভূমিকম্পের অভিঘাতে কুমামোতো শহরের একাধিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিউশু এক্সপ্রেসওয়ে (Kyushu Expressway)-এর বিভিন্ন অংশ ফেটে গিয়েছে এবং ঐতিহাসিক কুমামোতো দুর্গ (Kumamoto Castle)-এর প্রাচীরের একাংশ ধসে পড়েছে। বিভিন্ন সেতু, রাস্তা এবং পরিকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও মূল্যায়ন করছেন প্রশাসনের আধিকারিকরা।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কুমামোতো শহরের এইয়ন শপিং মল (Aeon Mall)-এ। ভূমিকম্পের সময় দ্বিতীয় তলার একটি অংশ ভেঙে পড়ে। তার কিছুক্ষণ পরেই মলের ভিতরে বিস্ফোরণ ঘটে, যার জেরে ভবনের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ইস্পাতের কাঠামো বাইরে বেরিয়ে আসে।
ভূমিকম্পের সময় প্রায় ২০০ জন ক্রেতাকে নিরাপদে বের করে আনতে সক্ষম হন কর্মীরা। তবে বিস্ফোরণের পর প্রথমদিকে ২০ থেকে ৩০ জন কর্মীর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না বলে জানায় NHK। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ঘটনাস্থলে গ্যাসের গন্ধ পাওয়া গিয়েছিল, যদিও বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ এখনও নিশ্চিত নয়।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ২০১৬ সালের বিধ্বংসী কুমামোতো ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর পুনর্নির্মাণ করে গত জুন মাসেই এই শপিং মলটি পুনরায় চালু করা হয়েছিল। সেটিই আবার বড়সড় ক্ষতির মুখে পড়ল।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি (Sanae Takaichi) জানিয়েছেন, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৩ হয়েছে। তাঁর কথায়, এখনও বহু মানুষ উদ্ধারের অপেক্ষায় রয়েছেন এবং প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর, ধসে পড়া শপিং মলের ভিতর থেকে বুধবার ভোরে কুড়ির কোঠার দুই মহিলার দেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
বিভিন্ন হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসা চলছে। একটি হাসপাতালে ৫০ জনেরও বেশি এবং অন্য একটি হাসপাতালে প্রায় ৪০ জনকে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে অন্তত ১০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছে NHK।
এদিকে প্রায় ২ লক্ষ ৬০ হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। এখনও ৩৬ হাজারেরও বেশি বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থলের কাছাকাছি উকি (Uki) শহরের একটি হাসপাতাল বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাভাবিক পরিষেবা চালাতে পারছে না।
জাপান আবহাওয়া সংস্থা সতর্ক করেছে, প্রবল আফটারশকের পাশাপাশি পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকিও বেড়েছে। অন্যদিকে তাপমাত্রা ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছতে পারে বলে উদ্ধারকারী দল এবং সাধারণ মানুষকে হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি সম্পর্কেও সতর্ক করা হয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ জাপান। কারণ দেশটি প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার (Pacific Ring of Fire) অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে একাধিক টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষ ও সঞ্চালনের কারণে নিয়মিত ভূমিকম্প হয়। কঠোর নির্মাণবিধি ও নিয়মিত মহড়া প্রাণহানি অনেকটা কমালেও শক্তিশালী ভূমিকম্প এখনও বড় ধরনের ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। কুমামোতোর সাম্প্রতিক বিপর্যয় সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে এনে দিল।


Leave a Comment